আজ, বুধবার | ৬ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ | ১৯শে নভেম্বর, ২০১৯ ইং | ভোর ৫:৩১                                                                          

ব্রেকিং নিউজ :
শালিখায় কামড়িয়ে শিক্ষকের ঠোট ছিড়েছে আরেক শিক্ষক! মাগুরার মহম্মদপুরে বিদ্যুতায়িত হয়ে গৃহবধূর মৃত্যু নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে মাগুরায় বিএনপির বিক্ষোভ মাগুরায় রাইড শেয়ারিং কোম্পানির ‘পাঠাও’ থেকে ৪৯০ বোতল ফেন্সিডিল উদ্ধার মহম্মদপুরের মোবারকপুর গ্রামে ঝোপ থেকে নারীর গলিত লাশ উদ্ধার মাগুরায় ইয়াবাসহ মাদক কারবারি রাজিবকে আটক করেছে র্যাব মাগুরায় বাড়িতে বাড়িতে চলছে তথ্য অফিসের উন্মুক্ত উঠোন বৈঠক ডুসামের নতুন কমিটিতে নাহিদ সভাপতি এবং আরমান সম্পাদক নির্বাচিত মাগুরার কাটাখালি স্কুলে তথ্য অফিসের চলচ্চিত্র প্রদর্শন ও কুইজ প্রতিযোগিতা মহম্মদপুরে মান্নান-লিটন আওয়ামীলীগের সভাপতি-সম্পাদক নির্বাচিত
বঙ্গবন্ধুকে রক্ষায় সৈন্য পাঠাতে ব্যর্থ হন সেনাপ্রধান শফিউল্লাহ

বঙ্গবন্ধুকে রক্ষায় সৈন্য পাঠাতে ব্যর্থ হন সেনাপ্রধান শফিউল্লাহ

জাহিদ রহমান: সেদিন তিনি যদি একদল সৈন্য নিয়ে পাল্টা প্রতিরোধ করতে পারতেন তাহলে হয়তো বঙ্গবন্ধুসহ পরিবারের অনেকেই বেঁচে যেতেন। কারণ ১৫ আগস্ট ভোরে রশিদ-ফারুক ট্যাংক নিয়ে যে বত্রিশ নাম্বারের দিকে ছুটছে সে খবর তিনি আগেই পেয়েছিলেন।

স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সেনাবাহিনী প্রধান হয়েছিলেন কর্নেল কাজী মুহাম্মদ শফিউল্লাহ। যিনি কেএম শফিউল্লাহ হিসেবে বেশি পরিচিত। ৭২ সালের ৫ এপ্রিল কেএম শফিউল্লাহ সেনাপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব প্রাপ্ত হন বঙ্গবন্ধুর ইচ্ছেতেই।

সেনাপ্রধান হওয়ার আগে তিনি ছিলেন একজন লেফটেন্যান্ট কর্নেল। এরপর পদোন্নতি পেয়ে তিনি সর্বশেষ মেজর জেনারেল হন ৭৩ সালের ১০ অক্টোবর। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিন নম্বর সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন তিনি। ‘এস’ ফোর্সের প্রধানও ছিলেন তিনি।

মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ অবদানের জন্য তিনি বীরউত্তম খেতাবে ভূষিত হন। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনের এই বীরউত্তম ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে রক্ষায় একজন সৈন্যও পাঠাতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। তাঁর সেই ব্যর্থতা এখনও হাজারো প্রশ্নের অবতারণা করে।

অনেকেই মনে করেন তাঁর অমার্জনীয় ব্যর্থতার কারণেই ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ড ত্বরান্বিত হয়েছিল। সেদিন তিনি যদি একদল সৈন্য নিয়ে পাল্টা প্রতিরোধ করতে পারতেন তাহলে হয়তো বঙ্গবন্ধুসহ পরিবারের অনেকেই বেঁচে যেতেন। কারণ ১৫ আগস্ট ভোরে রশিদ-ফারুক ট্যাংক নিয়ে যে বত্রিশ নাম্বারের দিকে ছুটছে সে খবর তিনি আগেই পেয়েছিলেন।

২০০২ সালের আগস্টের প্রথম সপ্তাহে বাংলাদেশের প্রথম সেনাপ্রধান কেএম শফিউল্লাহর সাক্ষাৎকার গ্রহণের সুযোগ হয়েছিল তাঁর ক্যান্টনমেনস্থ বাসায় বসে। দেশের একটি শীর্ষ দৈনিকে সাক্ষাৎকারটি ছাপা হয়েছিল।

সেসময় তাঁর কাছে প্রথম প্রশ্ন ছিল- বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে আপনার সর্বশেষ দেখা ও কথা হয় কত তারিখে?

মে. জে. (অব.)শফিউল্লাহ এই প্রশ্নের উত্তরে বলেন,

‘বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমার সর্বশেষ কথা হয় ১৫ আগস্ট ভোররাতে। ভোররাতেই আমি জানতে পারলাম একটা কিছু ঘটতে যাচ্ছে। এটি আমাকে ইনফর্ম করেন মিলিটারি ইন্টিলেজেন্সের ডিরেক্টর কর্ণেল সালাহউদ্দিন। তিনিই প্রথম এসে আমাকে জানান আরমাররা ক্যান্টনমেন্টের নির্দিষ্ট সীমানা পাড়ি দিয়ে ৩২ নম্বরের দিকে চলে যাচ্ছে। এরকম কোনো অনুমতি আছে কিনা। এসময় আমি তাঁকে ফোরটি সিক্স ডিভিশনের ব্রিগেড কমান্ডার শাফায়াত জামিলের কাছে বিষয়টি বিশদভাবে জানার জন্য এবং ফোর্সমুভ করার জন্য প্রেরণ করি।

এদিকে আমি ক্যান্টমেন্টের বাসায় বসে বঙ্গবন্ধুকে পাবার জন্য চেষ্টা করতে থাকি। কিন্তু বারবারই লাইন এনগেইজড পাই। তবু আমি চেষ্টা করতে থাকি।

এই ধারাবাহিক চেষ্টার মধ্যে আমি ফোনে বঙ্গবন্ধুকে পেয়ে যাই। উনাকে ফোনে পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বঙ্গবন্ধু আমাকে কথাটা এভাবে বললেন যে, শফিউল্লাহ তোমার ফোর্স আমার বাড়ি অ্যাটাক করেছে। কামালকে বোধ হয় মেরে ফেলেছে। তুমি দ্রুত ফোর্স পাঠাও।

এ কথাগুলো শোনার পর আমি শুধু উনাকে এই কথাগুলো বলতে পেরেছিলাম যে, স্যার আই অ্যাম ডুইং সামথিং। ক্যান ইউ গেট আইট অফ দ্যা হাউস।

উনি আর আমার কথার উত্তর দিলেন  না।

মনে হলো যে উনি টেলিফোন সেটটি পাশে রেখে দিলেন।

তিনি আরও বললেন, ১৫ আগস্ট সকালে বঙ্গবন্ধুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কনভোকেশন সিরিমনি অনুষ্ঠানে যাওয়ার কথা। ১৪ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বোমা বিস্ফোরণের একটা ঘটনা ঘটে।

এই ঘটনার পর তৎকালীন আইজি নূরুল ইসলাম আমাকে বলেন সেনাবাহিনীর এক্সপ্লোসিভ এক্সপার্ট পাঠানোর জন্য। কেন না পুলিশের তখন এক্সপ্লোসিভ এক্সপার্ট ছিল না। আমি নূরুল ইসলামের অনুরোধে ইঞ্জিনিয়ার ডিপার্টমেন্টের এক্সপার্টদের পাঠালাম।

ওই দিন এমন একটা কথা শোনা যাচ্ছিল যে, বঙ্গবন্ধু ক্যাম্পাসে গেলে জিএসডি মানে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদের ক্যাডাররা একটা কিছু ঘটনা ঘটাবে। ফলে বঙ্গবন্ধুর প্রাইভেট সেক্রেটারী কর্ণেল জামিলের (১৫ আগস্ট যার ডিজিএফআই এর প্রধান হওয়ার কথা) নেতৃত্বে ওইদিন ডিজিএফআই, এনএসআই, ডিবি এসবিসহ সমস্ত ইন্টেলিজেন্সের লোক ক্যাম্পাসে নজরদারি রাখে। কিছু পায় কিনা সেটা অন্য কথা।

কিন্তু ওই দিন অনেক কাকতলীয় ঘটনা ঘটে।

১৪ তারিখ বিকেলে কিন্তু একটা ভারতীয় সামরিক বিমান ফেনীতে ক্র্যাশ হয়ে যায় এবং বিমানের সব পাইলট মারা যান। ওই বিমানটি ভারত আমাদেরকে দিয়েছিল চট্টগ্রামের হিলট্র্যাক্স এলাকায় অপারেশনের জন্য।

১৪ তারিখে সংঘটিত ওই দুর্ঘটনার জন্য আমরা বেশ ব্যস্ত সময় কাটাই। কুমিল্লার বিগ্রেড কমান্ডারকে ঘটনাস্থলে পাঠাই। ওখান থেকে মরদেহ এনে বাক্সবন্দি করি। রাত প্রায় দুটো পর্যন্ত এসব নিয়ে আমি ব্যস্ত থাকি।

আরও এক কাকতালীয় ঘটনার কথা বলি।

সপ্তাহের বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার রাতে নরম্যালি আরমার (ট্যাংক) ও নতুন আর্টিলারি নাইট ট্রেনিং করতো। তারা ক্যান্টনমেন্ট  ও এয়ারপোর্ট এলাকায় ট্রেনিং করতো। ওই দিন রাতে যখন ট্যাংক নিয়ে বেরিয়েছে তখন সবাই ধরে নিয়েছে এটি সেই রুটিনমাফিক ট্রেনিংয়েরই অংশ। কিন্তু যখন দেখা গেল ক্যান্টনমেন্ট লিমিট পার হয়ে ট্যাংকগুলো ৩২ নম্বর এবং রেডিও স্টেশনের দিকে যাচ্ছে তখন সবার টনক নড়ে। আর ইন্টেলিজন্সের লোকের মধ্যে এমন কথা বলাবলি হচ্ছিলো যে অমন একটা ছোটখাট ঘটনার জন্য (ক্যাম্পাসে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা) আরমার ও আর্টিল্যারিকে পাঠানো হচ্ছে প্রটেকশনের জন্য। আসলে ইন্টেলিজেন্সের লোকও বুঝতে পারেনি আর্টিল্যারি কোথায় যাচ্ছে।

এরপরে প্রশ্ন করেছিলাম ঠিক আছে, বঙ্গবন্ধু সাহায্য চাইলেন। আপনি বুঝতে পারছেন কী ঘটতে যাচ্ছে। তাহলে ফোর্স পাঠাতে পারলেন না?

উত্তরে বললেন, ‘আমি তো বঙ্গবন্ধুকে বললাম, স্যার আইএ্যাম ড্রইং সামথিং।

তার আগেই তো শাফাতকে অর্ডার দিয়েছি। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কথা শেষ হওয়ার পর আমি অপেক্ষা করছি। কিন্তু দেখি ঢাকা ব্রিগেড থেকে কোনও মুভমেন্ট হচ্ছে না। যেহেতু মুভমেন্ট হচ্ছে না, তখন আমি সিজিএস ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফকে পাঠিয়ে বললাম তুমি গিয়ে দ্যাখো-হোয়াই হি (শাফাত জামিল) ইজ নট মুভিং হিজ ট্রপস। হোয়াই হি ইজ নট সেন্ডিং হিজ ট্রপস।

এরপর আমি অফিসে বসে অপেক্ষা করছি। এর মধ্যে আমার ইডিসি ক্যাপ্টেন হুমায়ুন কবীর এসে বলেন, স্যার বঙ্গবন্ধু ইজ ডেড। ন্যাচারালি এ সংবাদ আমাকে মর্মাহত করে। এরপর আমি ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশারফদের টেলিফোনে পেলাম।

খালেদ বলল, স্যার, নো ট্রুপস ইজ মুভিং।

আমি বললাম, কেন? সে বলল, দে থট দা আর্মি হ্যাজ রিভোল্টেড। এবং সে এও বলল, আমাকে কেউ কথা বলতে দিচ্ছে না।

ঠিক এরকম পরিস্থিতিতে আমি বললাম, তুমি এসে আমার কাছে সব বল।

খালেদ বলল, স্যার আমাকে মাত্র ১৫ মিনিটের জন্য আসতে দিন।

এর মধ্যে খালেদ এলো। খালেদ কেবল কথা শুরু করবে এমন সময় মেজর ডালিম ১৫ থেকে ১৬ জন সৈন্য নিয়ে আমার রুমে ঢুকলো।

বেলা তখন প্রায় আটটা। সবার বন্দুক আমার দিকে তাক করা।

আমি তখন ডালিমকে বললাম, দেখো ডালিম আমি এইসব অস্ত্র দেখেছি ও ব্যবহার করেছি (ইংরেজীতে)। তুমি যদি অস্ত্র ব্যবহার করতে আসো তাহলে করো। আর যদি কথা বলতে আসো তাহলে অস্ত্র ও তোমার  লোকজনদেরকে বাইরে রাখো, তারপর কথা বলবো।

ডালিম একথা শুনে অস্ত্র নিচে নামিয়ে রাখল।

এরপর বলল, স্যার প্রেসিডেন্ট আপনাকে রেডিও স্টেশনে ডেকে পাঠিয়েছেন, আমি বললাম, আমি তো জানি প্রেসিডেন্ট মারা গেছেন।

ডালিম তখন এ শুনে বলল, ইউ সুড নো খোন্দকার মোশতাক ইজ এ প্রেসিডেন্ট নাউ।

আমি বললাম, খোন্দকার মোশতাক মে বি ইউর প্রেসিডেন্ট, হি ইজ নট মাইন।

সে (ডালিম) বলল, আমাকে এমন কিছু করতে বাধ্য করবেন না যা আমি করতে আসিনি।

আমি বললাম, ইউ ক্যান ডু এনিথিং।

এ কথা বলে আমি উঠে অনেকটা ঠেলেই ওদের মধ্যে থেকে গাড়িতে উঠলাম। আমি ৪৬ ব্রিগেডে গেলাম। ৪৬ বিগ্রেডে গিয়ে দেখি তারা চুপ করে সব বসে আছে। স্বভাবতই আমি একা আমার সঙ্গে আর কেউ নেই।

জাহিদ রহমান, সম্পাদক-মাগুরা প্রতিদিন ডটকম

শেয়ার করুন...




©All rights reserved Magura Protidin.
IT & Technical Support :BiswaJit