আজ, শনিবার | ২রা অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ | ১৫ই নভেম্বর, ২০১৯ ইং | রাত ২:৫২                                                                          

ব্রেকিং নিউজ :
মহম্মদপুরের মোবারকপুর গ্রামে ঝোপ থেকে নারীর গলিত লাশ উদ্ধার মাগুরায় ইয়াবাসহ মাদক কারবারি রাজিবকে আটক করেছে র্যাব মাগুরায় বাড়িতে বাড়িতে চলছে তথ্য অফিসের উন্মুক্ত উঠোন বৈঠক ডুসামের নতুন কমিটিতে নাহিদ সভাপতি এবং আরমান সম্পাদক নির্বাচিত মাগুরার কাটাখালি স্কুলে তথ্য অফিসের চলচ্চিত্র প্রদর্শন ও কুইজ প্রতিযোগিতা মহম্মদপুরে মান্নান-লিটন আওয়ামীলীগের সভাপতি-সম্পাদক নির্বাচিত মাগুরা একসঙ্গে তিনটি পুত্র সন্তানের জন্ম দিলেন রাশিদা বেগম প্রধানমন্ত্রীকে লেখা মাগুরার প্রবীণ আওয়ামীলীগ নেতা নুরুজ্জামানের খোলা চিঠি মাগুরায় পিয়ারলেসে ফায়ার সপ্তাহ উপলক্ষে সচেতনতামুলক প্রশিক্ষণ জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু বলেছেন-দেশে দূর্ণীতিবাজ দলবাজ লুটেরারা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে
ভালবাসার অনন্যজন ‘নিরো স্যার’

ভালবাসার অনন্যজন ‘নিরো স্যার’

জাহিদ রহমান : শ্রদ্ধেয় ‘নিরো স্যার’-পুরো নাম মাহফুজুল হক নিরো। আদর্শ শিক্ষকের এক অনন্য প্রতিকৃতি।

মাগুরা সরকারি কলেজে ইংরেজির দাপুটে শিক্ষক হিসেবে যিনি আমাদের কালে নায়ক হিসেবে খ্যাত ছিলেন। নায়ক বলছি এই কারণে ‘নিরো স্যার’ কেবলই আদর্শ শিক্ষক ছিলেন না। শিক্ষকতার বাইরে প্রবল ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন ও প্রতিভাবন হওয়ার কারণে প্রকৃতার্থেই তিনি ছিলেন নায়কের মতো।

ছিলেন পৌরুষদীপ্ত, রাশভারী, আড্ডাবাজ আবার সদাহাস্যময়ও। কবিতা লিখতেন, আবৃত্তি করতেন। রবীন্দ্র-নজরুল তাঁর ভীষণ প্রিয় ছিল। ভাল গানও গাইতে পারতেন। আবার সাহিত্যের ছাত্র হলেও সমাজের জটিল রাজনৈতিক-সমাজিক মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণেও মনোযোগী ছিলেন। এ কারণেই হয়তো চিন্তার পৃথিবী বাড়াতে বালকবেলাতেই তাঁর দাবা খেলার প্রতি অসম্ভব ঝোঁক ছিল। ভাল দাবা খেলতেন আবার ভাল শাটলারও (ব্যাডমিন্টন খেলোয়াড়) ছিলেন। আর সমাজ বদল ও সমাজতন্ত্রের লড়াইটাকে তিনি অন্তরে লালন করতেন এবং ভালবাসতেন।

গণমানুষের মুক্তির লড়াই-এর স্বপ্নটা তাঁর মধ্যে ছিল মৃত্যু অব্দি। সেই চিন্তা থেকে তিনি বিচ্যুত হননি কখনও। তবে এ সবকিছুর বাইওে একজন ‘নিরো স্যার’- এই শব্দযুগলই যেনো আমাদের মস্তককে অবনত করে।

বার্ধক্যজনিত কারণে বেশ আগে থেকেই শয্যাশায়ী ছিলেন শ্রদ্ধেয় ‘নিরো স্যার’। চিরবিদায় নিয়ে তিনি চলে গেলেন গত ৫ অক্টোবর। তাঁর প্রস্থানে অবশ্যই শূন্যতা অনুভূত হয় মাগুরার হ্নদয়ে। আলাপে-আড্ডায় অনেকেরই দীর্ঘশ্বাসে উচ্চারিত হয় ‘এমন আত্মমর্যাদা আর ন্যায়-নীতি সম্পন্ন শিক্ষক আর কবে আসবেন।’

মাগুরা কলেজে তিনি আমার সরাসরি শিক্ষক ছিলেন। এটি অবশ্যই ভাগ্যের ব্যাপার। মাগুরা সরকারি কলেজে ভর্তি না হলে নিরো স্যারের মতো একজন শিক্ষকের দেখা পেতাম না। আশির দশকের প্রারম্ভে শ্রীপুরের এক অজপাড়া গাঁ থেকে মাগুরা সরকারি কলেজে এইচএসসিতে ভর্তি হতে এসেই শুনতে পাই নিরো স্যারের কঠিন-কঠোর আপোষহীন ব্যক্তিত্বের কথা। ক্লাস শুরু হওয়ার পর দেখি সত্যি সত্যিই তাই।

প্রথম স্যারকে যেদিন ক্লাসে পেলাম মনে হলো-শ্রেণীকক্ষে কোনো এক নায়ক ঢুকলেন। হাঁটার স্টাইল থেকে শুরু করে পরিচ্ছন্ন পোশাকের ভাঁজ-সবকিছুর মধ্যেই নায়ক সাদৃশ্য উপস্থিতি। স্যার আসার পর ক্লাসরুমে পিনপত্তন নীরবতা। কোনো শব্দ নেই। সংক্ষিপ্ত কূশল বিনিময়ের পর স্যার পড়াতে শুরু করলেন।

শুদ্ধ উচ্চারণ আর চমৎকার বাক্যচয়নের বিমুগ্ধতা যেনো ছড়িয়ে পড়লো ক্লাস রুমে। সেই দিন থেকেই নিরো স্যারের ছাত্র হিসেবে গর্বে বুকটা ভরে উঠলো। এরপর যত জায়গাতে যেতাম গর্বের সাথে বলতাম ‘নিরো স্যার’ আমাদের ক্লাস নেন।

‘নিরো স্যার’ বেশিরভাগ সময় একাদশ শ্রেণীর ইংরেজি বই-এর পাঠ্য কবিতাগুলো পড়াতেন। মনে আছে আলফ্রেড লর্ড টেনিসনের দ্য ব্রæক, রবার্ট ব্রাউনিং এর দ্য প্যাট্রিয়ট কবিতা তিনি অসাধারণ ভঙ্গীমায় পড়াতেন। তিনি যখন পড়াতেন আমরা বিমুগ্ধ চিত্তে চেয়ে থাকতাম। ক্লাস শেষ করে স্যার যখন বই হাতে ধীর গতিতে ক্লাসরুম থেকে বের হতেন তখন সবাই যেনো মুক্ত মনে নিঃশ্বাস নিতে শুরু করতো।

স্যারের সমাজভাবনা আমার বরাবরই আকৃষ্ট করতো। সুযোগ পেলে আলাপে আড্ডায় সেই ভাবনার কথাগুলো বলতেন।

মনে আছে ৮২ সালে এরশাদের সামরিক শাসন শুরু হওয়ার পর এরশাদ বিরোধী আন্দোলন মাগুরাতেও শুরু হয়। খুব সম্ভবত ৮৩ সালের দিকে মাগুরাতে ১৫ দলীয় জোটের একটি মিটিং অনুষ্ঠিত হয়। সেই সভায় অগ্নিকণ্যা খ্যাত বেগম মতিয়া চৌধুরীও উপস্থিত ছিলেন। পুরনো কোর্টপ্রাঙ্গনে অনুষ্ঠিত সেই সভায় নিজের লেখা একটি বিপ্লবী কবিতা আবৃত্তি করেন নিরো স্যার। কলেজের বিভিন্ন অনুষ্ঠানেও কবিতা আবৃত্তি করতেন তিনি। গানও গাইতেন। সতীনাথ মুখোপাধ্যয় এবং মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যয় ছিল তাঁর প্রিয় শিল্পী। আমেরিকা থেকে ফোনে সেই গল্পই করছিলেন একসময়ের প্রখ্যাত ফুটবলার সৈয়দ নাজমুল হাসান লোভন। বলছিলেন, ‘নিরো স্যার অসংখ্য গুনের এক নান্দনিক মানুষ ছিলেন। শিক্ষা, খেলাধূলো এবং বাঙালি সংস্কৃতি-এসবই তিনি ধারণ করতেন হ্নদয়ে। বৈচিত্র্যময় এবং বর্ণিল জীবন ছিল তাঁর। বসে থাকতেন না। একবার ব্যাডমিন্টন খেলার এক প্রতিযোগিতায় স্যারের কাছে হেরে গেলাম। স্টেজে স্যারের গান গাওয়া-এখনও আমার চোখের সামনে ভাসে। সাংস্কৃতিক চর্চা আর নীতি নৈতিকতায় অটুট এমন মানুষ পাওয়া এখন দুষ্কর।

ভীষণ আড্ডাপ্রিয় মানুষ ছিলেন ‘নিরো স্যার’। গরম চা খেতে খেতে সাহিত্য-সমাজ-দর্শন নিয়ে মেতে উঠা ছিল তাঁর প্রিয় অভ্যাস। মাগুরা শহরের কোথায় তিনি আড্ডা দিতেন তা কারো অজানা বিষয় নয়। সেই আড্ডার খোঁজ নিতে যোগাযোগ করেছিলাম চা-বিক্রেতা কাঞ্চিরাম দাদার কাছে। যিনি ‘নিরো স্যারে’র দীর্ঘ আড্ডার জীবন্ত এক সাক্ষী। মাগুরা শহরের টাউন হল ক্লাবের পাশে কাঞ্চিরামের (মাগুরাতে বলা হয় কাঞ্চের দোকান) চায়ের দোকানে আড্ডা দিতেন অনেক আগে থেকেই।

কাঞ্চিরামের ভাষ্যমতে মুক্তিযুদ্ধের আগে থেকেই নিরো স্যার তাঁর বন্ধু-সতীর্থদের টাউন হল ক্লাব সংলগ্ন চায়ের দোকানে আড্ডা দিতে আসতেন। এই চায়ের দোকানটি আগে পরিচালনা করতেন মাগুরার সদরের আঠারোখাদার গ্রামের নিমাই সেন। মুক্তিযুদ্ধের আগেই চা বিক্রেতা নিমাই সেন চলে যান ভারতে। পরে দোকানটি পরিচালনার দায়িত্ব নেন তিনি।

কাঞ্চিরাম বলেন- চায়ের দোকানে স্যার ছাড়াও নিয়মিত আসতেন ব্যবসায়ী আজিজ মিয়া, ব্যবসায়ী সন্তোষ দত্ত, অ্যাডভোকেট নিতাই বাবু, আক্তার মিয়া, আবুল খানসহ আরও অনেকে। প্রতিদিন চায়ের আড্ডায় না এলে স্যারের দিনটাই যেনো অপূর্ণ থেকে যেত। তাঁর সঙ্গীসাথীরা অনেকেই আগে চলে গেছেন। এবার স্যারও চলে গেলেন।

কাঞ্চিরামের চায়ের দোকানে দোকানে কাজ করে নিমাই নামের কর্মচারী। নিমাই নিরো স্যারের এক ভক্তজন। অশেষ স্নেহ পেয়েছেন স্যারের। স্যারের কথা তাই ভুলতে পারেন না তিনি।

নিমাই বলেন, ‘৯৫-৯৬ সালের কথা। অর্থাভাবে আমাদের লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়। স্যার একদিন এসে বলেন, আমার বাসায় আস, তোদের আমি পড়াব। লেখাপড়া বন্ধ করবি না। স্যারের কথা মতো আমি, শাহিন ও বিজয় আমরা তিনজন স্যারের বাসাতে গিয়ে পড়তে থাকি। স্যারের সেই পড়ানোর কথা ভুলব না। তাঁর পড়ানোতে ছিল অন্যরকম এক মাধুর্য। স্যারের কাছে ইংলিশ ছিল পানির মতো। ইংরেজি পড়াতে বেশি ভালবাসতেন।’

জীবনের শেষ বয়সেও নিরো স্যার উজ্জীবিত থেকেছেন। মানুষের জন্য কাজ করতে চেয়েছেন। আর তাই মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। জীবনের শেষ দিনগুলোতে তাই কখনই বসে থাকেননি। জনগণের পাশে থেকেছেন, জনগণের কথা বলতে  চেয়েছেন। আর এ কারণেই জাতীয় তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ রক্ষা কমিটির সভায় সারথী হয়েছেন। সুন্দরবন বাঁচাও আন্দোলনে যুক্ত হয়ে অন্যদের অনুপ্রাণিত করেছেন। সরকারি উদ্যোগে বিভিন্ন স্কুলে বই বিতরণ অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে সাঁতার প্রশিক্ষণ সবখানেই উপস্থিত হয়ে নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রেরণা দিয়েছেন। ঈদ-পুজা-পার্বনে অসহায় শিশুদের মুখে হাসি ফোটাতে নিজের টাকা দিয়ে নতুন পোশাক কিনে দিয়েছেন। এরকম আরও আরও অনেক উদাহরণ রয়েছে।

সবশেষে স্যারের অসীম সাহসের কথা বলবো। চুরাশি সালের কথা। সারাদেশে এরশাদ বিরোধী আন্দোলন তুঙ্গে।

দেশের বিভিন্ন কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন বাংলা ছাত্র সমাজের গুন্ডারা পেশী শক্তি প্রদর্শন করছে। একদিন কলেজ প্রাঙ্গণে চড়াও হন নতুন বাংলা ছাত্র ও যুব সমাজের কর্মীরা। রাম-দা হাতে ভায়না-পাল্লা এলাকার একদল যুবক স্যারের উপর চড়াও হন। স্যার কমন রুমের সামনে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন। কিন্তু বরাবরের মতোই ‘নিরো স্যার’ সাহসী ও আপোষহীন। ‘আমাকে মারবে’-একথা বলতেই কোনো যুবকই আর স্যারের দিকে তাকানোর সাহস পেল না। আসলেই কেউই স্যারের দিকে তাকিয়ে ক্ষুব্ধ বা ক্রুদ্ধ আচারণ দেখানোর সাহস পেত না। স্যারের প্রখর ব্যক্তিত্বের কাছে সবাই হেরে যেত মুহূর্তেই।

‘নিরো স্যার’ ইহলোক ত্যাগ করলেও তিনি অবিনশ্বর। তাঁর চলা, বলা, লেখা আর ব্যক্তিত্বের দ্যুতির যে অনুপমতা-তা তার সব শিক্ষার্থী, স্বজন, অনুজ সবার স্মৃতিতে অমলিন থাকবে অনেক অনেক দিন। ন্যায়ের প্রশ্নে আপোষহীন, আমৃত্যু অসাম্প্রদায়িক এই ‘শিক্ষাগুরু’ আমাদের আলোর পথের দিশারী হয়ে থাকবেন। আমাদের হ্নদয়ে ভালোবাসার অনন্যজন হয়ে থাকবেন মেধা, প্রজ্ঞার শ্রদ্ধেয় ‘নিরো স্যার’।

জাহিদ রহমান : সম্পাদক, মাগুরা প্রতিদিন ডটকম

শেয়ার করুন...




©All rights reserved Magura Protidin.
IT & Technical Support :BiswaJit