আজ, রবিবার | ৯ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ | ২৫শে অক্টোবর, ২০২০ ইং | রাত ৯:৫১

ব্রেকিং নিউজ :
মাগুরার দুরাননগরে যুবকদের শ্রম বিক্রির অর্থে দরিদ্র মানুষের ঘরে ত্রাণ মহামারি করোনা : হেসে উঠুক আমাদের ভালবাসার পৃথিবী মাগুরায় করোনা রোগী: ভয় নয়, আরও দায়িত্বশীল হই চাউলিয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে ত্রাণ নিয়ে অসহায় মানুষের পাশে সাহেব আলি ছকাতি মাগুরায় ঢাকা থেকে ফেরা আরো এক যুবক করোনা আক্রান্ত গ্রাম লক ডাউন ঘোষণা মাগুরায় ৫ শতাধিক ইমাম মোয়াজ্জিনের মধ্যে এমপি শিখরের নগদ অর্থ ও খাদ্য সহায়তা প্রদান মাগুরায় আশুলিয়া থেকে ফেরত যুবক করোনায় আক্রান্ত গ্রাম লকডাউন মাগুরায় ইঞ্জিনিয়ার মিরাজের নেতৃত্বে ১৪শত পরিবারের মধ্যে ত্রাণ ও স্যানিটাইজার বিতরণ মাগুরাসহ যশোর অঞ্চলে জনসচেতনায় কাজ করে যাচ্ছে সেনা সদস্যরা করোনা প্রতিরোধে মাগুরা সিভিল সার্জনকে জাসদের ৭টি প্রস্তাব
করোনা ভাইরাস এবং আমাদের ক্রান্তিকাল

করোনা ভাইরাস এবং আমাদের ক্রান্তিকাল

জাহিদ রহমান : গোটা বিশ্বের মানুষ এখন সবচেয়ে করুণ এক দুঃসময় অতিক্রান্ত করছে। চীনের জনবহুল উহান থেকে আবির্ভূত ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র একটি ভাইরাসের কারণে পুরো বিশ্বাবাসী আজ স্তব্ধ। উন্নত বা অনুন্নত কোনো দেশেরই যেনো এই ভাইরাস থেকে পরিত্রাণ মিলছে না। চীন থেকে উত্পত্তি ‘করোনাভাইরাস’ এখন এক মহাআতঙ্কের নাম।

প্রতিদিনই এই ভাইরাস শত শত জীবন কেড়ে নিচ্ছে। মানুষের যাপিত জীবনকে একেবারে থামিয়ে দিয়েছে এই ভাইরাস। এখন পর্যন্ত এই ভাইরাস প্রতিরোধ ও প্রতিষেধকে কোনো কার্যকর ঔষধ বা ভ্যাকসিনের আবিস্কার করাও সম্ভব হয়নি। গবেষকরা ভাইরাসের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে বলছেন-আরও সময় লাগবে। তবে আপাতত সমাধান এই জীবন বিধ্বংশী ভাইরাস থেকে দূরে থাকা। অর্থাত্ যিনি বা যে এই ভাইরাসে আক্রান্ত তার ধারের কাছেও যাওয়া যাবে না। এবং একই সাথে যিনি আক্রান্ত তার প্রথম চিকিৎসা হলো তাকে একা বা বিশেষ ব্যবস্থায় রাখা যাতে করে অন্যরা নিরাপদে থাকে। এ কারণে বিভিন্ন দেশে শুরু হয়েছে লকডাউন। ঘর থেকে একদম বের হওয়া যাবে না। নিয়মিত সেনিটাইজার মাখতে হবে। মাস্ক পরতে হবে। নির্দিষ্ট দূরুত্ব রেখে দাঁড়াতে হবে। কোথাও কোনো অবস্থাতে জটলা করা যাবে না।

এদিকে এই রোগ সনাক্তকরণ নিয়েও মহাবিপত্তি বেঁধেছে। প্রথমত এই রোগ নির্ণয়ের কীট বা যন্ত্রপাতির স্বল্পতাও তথ্যপ্রযুক্তিতে টইটম্বুর সব রাষ্ট্রের ভীষণ অক্ষমতাকে প্রকাশ করেছে। ফলে বিভিন্ন দেশে অক্রান্তদের শনাক্ত করা নিয়েও জটিলতা তৈরি হয়েছে।

এমতাবস্থায় এই ভাইরাসকে রুখে দেওয়া এবং বশে আনাটা এখন বিশাল এক যুদ্ধ ছাড়া কিছুই নয়। ঔষধবিজ্ঞানী, গবেষক, চিকিৎসক সবাই এখন শুধু হিমশিম খাচ্ছেন না, আতঙ্কগ্রস্তও হয়ে উঠেছেন।

২৮ মার্চ ২০২০ এই ভাইরাসের কারণে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৬ লক্ষ ১৪ হাজার ৭০৬ জন। এই ভাইরাসে এ পর্যন্ত মারা গেছেন ২৮ হাজার ২৪৪ জন। আক্রান্ত হওয়ার পর সুস্থ হয়ে ফিরে গেছেন ১৩৭,৩৪৪ জন (৮৩%)। যারা আক্রান্ত হয়ে আছেন এর মধ্যে সিরিয়াস অবস্থায় আছেন ২৩,৯৯৭ জন (৫%), বাদবাকি ৪২৫,১৩১ জন সন্তোজনক অবস্থানে আছেন।

এ পর্যন্ত এই ভাইরাসে সবচেয়ে বেশি ৯১৩৪ মানুষের মৃত্যু ঘটেছে ইতালিতে। এরপরেই ৬১৪২ জনের মৃত্যু ঘটেছে স্পেনে। উত্পতিস্থল চীনে এ পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে ৩২৯৮ জনের। এ ছাড়াও ইরান (২৬৫৬), ফ্রান্স (১৯৯৫) এবং আমেরিকাতেও (১৭১২) মৃত্যুর সংখ্যা।

ইউরোপ এবং আমেরিকাতে মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হওয়ার কারণে অসহায়ত্ব নেমে এসেছে চারিদিকে। শাসক এবং ধর্মীয় ও আধ্মাত্বিক নেতা থেকে সবাই তাই একবাক্যে বলেছেন কেবল মাত্র মানুষের ঐক্যই এই ভীষণ দমবন্ধ করা সময়কে জয় করতে পারে।

ইউরোপ, আমেরিকাতে করোনাভাইরাস যতোটা তীব্রগতিতে জীবন হরণ করে চলেছে ঠিক ততোটা দক্ষিণ এশিয়াতে নয়। তবে সবারই আশংকা হয়ত সামনেই চিত্র পাল্টে যাবে। কারণ এই ভাইরাস মূলত বহন করে এনেছে প্রবাসীরা এবং যারা সংক্রমিত দেশগুলোতে গিয়েছিল তারা। ফলে মহাবিপদের কারণকে কোনোভাবেই উড়িয়ে দেওয়া যাবে না।

এবার একটু দক্ষিণ এশিয়ার দিকে তাকানো যাক। দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় দেশ ভারত। ২০১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী ভারতের বর্তমান জনসংখ্যা ১২১ কোটিরও বেশি। যা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার এক ষষ্ঠাংশ।

আজ পর্যন্ত ভারতে মোট করোনা আক্রান্তের সংখ্যা ৯৭৯ জন। এর মধ্যে মারা গেছেন ২০ জন। পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যা বর্তমানে ২০ কোটির কাছাকাছি। করোনা মহামারিতে এ পর্যন্ত অক্রান্ত হয়েছেন ১৪৫৭ জন। এর মধ্যে মারা গেছেন ১৩ জন। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যা এখন ১৭ কোটির কাছাকাছি। প্রতি বর্গকিলোমিটারে গড় বসতি ১১১৬ জন। এ পর্যন্ত বাংলাদেশে করেনায় আক্রান্তে শনাক্ত হয়েছে ৪৮ জন। এর মধ্যে মৃত্যুবরণ করেছে ৫ জন। নেপালের বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় ৩ কোটি। এ পর্যন্ত সেদেশে করোনায় আক্রান্ত বলে শনাক্ত করা গেছে মোট ৬ জনকে। শ্রীলংকার মোট জনসংখ্যা ২ কোটির উপরে। সেদেশে এ পর্যন্ত করোনায় শনাক্ত হয়েছে মাত্র ১১৪ জন। এখন পর্যন্ত সে দেশে কোনো মৃত্যুও ঘটনা ঘটেনি। আফগানিস্তানের মোট জনসংখ্যা সাড়ে তিন কোটির উপরে। এখন পর্যন্ত সেদেশে করোনা আক্রান্ত বলে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে ১১৪ জনকে। সেদেশে কোনো মৃত্যুও ঘটনা ঘটেনি।

এ সবের বাইরে সার্কভুক্ত অন্য দুটি ক্ষুদ্র দেশ মালদ্বীপ এবং ভুটানেও আক্রান্তের সংখ্যা খুবই কম। এ দুটি দেশে আক্রান্ত বলে সনাক্ত করা গেছে মালদ্বীপে ১৬ জন এবং ভুটানে ৪ জন।

দক্ষিণ এশিয়ার এখন যে চিত্র তা দিয়ে ইউরোপ আমেরিকার করোনা ভাইরাসের ভয়বহতা পরিমাপ করা সম্ভব নয়। তবে এটা ঠিক করোনাভাইরাস প্রতিরোধে দক্ষিণ এশিয়ার সব দেশই নড়েচড়ে বসেছে। গোটা ভারতে টানা ২১ দিনের লকডাউন শুরু হয়েছে। করোনা আক্রান্তদের জন্য সরকার তহবিল গঠন ও নতুন হাসপাতাল তৈরি করা হয়েছে। রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ এর ধনকুবের মুকেশ আম্বানি নিজেই নতুন হাসপাতাল তৈরি করেছেন। করোনা ঠেকাতে শ্রীলংকাতে কার্ফু জারির ঘটনাও ঘটে। সেদেশেও নতুন নতুন হাসপাতাল তৈরি করা হয়েছে। সাবেক ভয়েস অফ আমেরিকা অফিস এবং নেভালদের অফিসকে করোনা আক্রান্তদের জন্য অফিসিয়ালি ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশেও লকডাউন চলছে। কাউকে অপ্রয়োজনে ঘর থেকে বের হওয়া নিষেধ করা হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার সবদেশেই করোনা আক্রান্তদের সংখ্যা কম হওয়ার কারণে জনমনে নানা প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে। খোদ ভারতেও এন্তার প্রশ্ন ঘুরাফেরা করছে।

জনবহুল দেশে ভারতে এখন যে সংখ্যক মানুষ আক্রান্ত বলে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে তা অনেকের মনকেই সাঁয় দিচ্ছে না। তবে সেদেশের অনেকেই মনে করছেন সনাক্তকরণ কীটের অভাবের কারণে এবং বিপুল সংখ্যক মানুষ সনাক্তের বাইরে থাকার কারণে হয়ত প্রকৃত চিত্র উঠে আসছে না। বাংলাদেশের বেলায়ও সেরকম ভাবছেন অনেকে।

 সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকে এরকম মত ব্যক্ত করছেন যে সঠিক তথ্য প্রকাশ পাচ্ছে না। আইইডিসিআর এর পক্ষ থেকে প্রতিদিন ব্রিফিং এ যে সংখ্যা চিত্র তুলে ধরা হচ্ছে সেটা সঠিক নয়, আক্রান্তের সংখ্যা আরও অনেক বেশি। তবে এটা ঠিক যে আমাদের দেশে প্রতিদিন আইইডিসিআর-এর পক্ষ থেকে পরিচালক মীরজাদি সেব্রিনার বদলে ব্রিফিংটা স্বাস্থ্যমন্ত্রী করলে সেটা আরও সঠিক পদক্ষেপ হতো। এই নিয়মিত ব্রিফিং সরকারের উচ্চমহলের আরও দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গের উপস্থিতি একান্ত কাম্য ছিল। কিন্তু সেটি মোটেও দেখা যাচ্ছে না। ফলে জনমনে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। তবে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে এখন পর্যন্ত এই ভাইরাসের যে গতিপথ সেটা অব্যাহত থাকলে তাহবে আমাদেও জন্য এক পরম প্রাপ্তি।

এদিকে করোনা ভাইরাস প্রতিরোধ আমাদের সার্বিক প্রস্তুতিতেও অনেক ঘাটতি লক্ষণীয়। মনে হচ্ছে উচ্চমহলে সার্বিক সমš^য় নেই। এ কারণেই আকিজ শিল্পগোষ্ঠী উহানের মতো একটি হাসপাতাল করার যে উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল তা বাধার মুখে পড়েছে। সরকারের উচ্চমহল থেকে সমš^য় করা হলে কোনো কমিশনারের পক্ষে বাধা দেওয়া সম্ভব ছিল না। করোনা আক্রান্তদের চিকিৎসায় সম্ভাব্য উদ্যোক্তাদের সাথে এখনও সমš^য় না করাটা আমাদের নীতি-নির্ধারকদের নির্বুদ্ধিতা ছাড়া আর কিছুই নয়।

করোনা চীন, ইতালি, স্পেন, ইরান আমেরিকাতে যেভাবে বিস্তৃত হয়েছে তার সামান্য আমাদের এখানে সংক্রমণ ঘটলে আমাদের অবস্থা কতোটা ঝুঁকিপূর্ণ তা কারোরই না বুঝার কথা নয়। সরকারের উচ্চমহলের উচিত অপ্রয়োজনীয়, অপ্রাসঙ্গিক কথা না বলে কার্যকর পদক্ষেপ হাতে নিতে।

এখনও সময় আছে-সময় ফুরিয়ে গেলে এই দুঃসময় রুখে দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। শুধু মাস্ক নিয়ে চিন্তা না করে এখনই ডেডিকেটেড ডাক্তার, নার্স, সাহায্যকারী তৈরি করাটা সময়ের দাবি। প্রয়োজনে তাদের জন্য প্রণোদনার ঘোষণা দেওয়া হোক। দেশপ্রেমিক ডাক্তার, নার্স এবং স্বাস্থ্যকর্মী ছাড়া এই দুঃসময় পার করা অসম্ভব এক কাজ। তবে এই ক্রান্তিকাল থেকে পরিত্রাণে দরকার কেবলই সুসমন্বয়। সেই সমন্বয়ে কেন জানি ঘাটতি চোখে পড়ে।

লেখক : জাহিদ রহমান, সম্পাদক, মাগুরা প্রতিদিন ডটকম

শেয়ার করুন...




©All rights reserved Magura Protidin.
IT & Technical Support :BiswaJit